পৃথিবী যদি ৫ সেকেন্ডের জন্য অক্সিজেন হারিয়ে ফেলে তবে কি হবে?

সব পানি মিলিয়ে যাবে
সব পানিই মিলিয়ে যাবে

অক্সিজেন, ৩০ সেকেন্ড নাক মুখ বন্ধ করে থাকলেও যে গ্যাসটির জন্য আমাদের বিপিএম ১০০ তে পৌঁছে যায়! অক্সিজেন তথা অম্লজান একটি প্রাকৃতিক গ্যাস, আমাদের বায়ুমণ্ডলে যার পরিমাণ প্রায় ২১%। যদিও কিছু সুপার হিউম্যান নিশ্বাস বন্ধ করে সর্বোচ্চ ২৫ মিনিট পর্যন্ত থাকতে পেরেছে, তবে আমাদের সাধারন মানুষের এটা ছাড়া ১ মিনিটও থাকতে পারা বেগতিক! 

আচ্ছা, পৃথিবী যদি কেবল ৫ সেকেন্ডের জন্য অক্সিজেন হারিয়ে ফেলে তবে কি হবে? আমরা কি কখন ভেবে দেখেছি? হয়ত ভাবছি কি আর হবে, ৫ সেকেন্ড নিশ্বাস বন্ধ করে রাখা আর এমন কি, তাইতো? তবে আসলেই কি কিছুই হবে না? নাকি এমন কিছুও ঘটে যাবে, যা আমরা কখনও ভাবিও নি? 

ভাবছি,৫ সেকেন্ড নিশ্বাস বন্ধ রাখা আর এমন কি? তবে নিশ্চয়ই পুরো পৃথিবীর মাত্র ৫ সেকেন্ডের জন্য অক্সিজেন হারিয়ে ফেলা, ব্যাপারটি হবে খুব বিধ্বংসী, যা হয়ত আমরা সপ্নেও কখনো ভাবিনি।        

আপনার পায়ের নিচে কোন মাটি থাকবে না 

আপনার পায়ের নিচে মাটি থাকবে না
আপনার পায়ের নিচে মাটি থাকবে না

কোন বিপদের সময় বা খুব বেশি চিন্তার  সময় বলি না? পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল? হ্যা, যদি পৃথিবী থেকে আমাদের সবার জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস অক্সিজেন’টি কিছু সময়ের জন্যেও  চলে যায়; তবে সত্যি সত্যি আমাদের এই কথাটি আবার বলা লাগতে পারে। আমরা জেনে থাকব যে, আমাদের ভূত্বক এর ৪৫% ই কিন্তু বিশুদ্ধ অক্সিজেন গ্যাস। আর যখনই এই অক্সিজেন থাকবেনা বা ডিস-অ্যাপিয়ার হয়ে যাবে; সাথে সাথে পায়ের নিচের  মাটি ফাটল ধরতে শুরু করবে এবং ধুলোয় পরিণত হয়ে যাবে। তো ৫ সেকেন্ড বা কয়েক সেকেন্ডের জন্য পৃথিবী থেকে যদি অক্সিজেন বিলীন হয়ে যায়, তবে আপনি আপনার অবস্থানরত জায়গা থেকেই হয়ত একটি ‘ফ্রি ফল’ (মুক্ত পতন) এর অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। তবে তারপর  ইহকালে না পরকালে যাবেন সেটা বলা যাচ্ছে না। 

মানুষের শ্রবণক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে 

আপনার শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে
আপনার শ্রবণ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে

আমাদের কান আউটার,মিডল এবং ইনার তিনটি ভাগে বিভক্ত। এর ভেতর মিডল অংশের ভেতর থাকে আমাদের ইয়ারড্রাম তথা পর্দা, পাশাপাশি বহিঃ পৃথিবীর সাথে সংযোগ রক্ষা করার জন্য এই মিডল অংশে থাকে একটি ছোট্ট নালিকা, ইউস্টাচিয়ান টিউব। লক্ষ করে দেখবেন আমরা যখন খাবার গিলি তখন কানের নিচের সাইডে একটা হালকা ক্লিক অনুভব করি। এটা হয় কারন আমাদের মুখের নড়াচড়ার সাথে সাথে ইউস্টাচিয়ান টিউবে ছোটো ছোটো অক্সিজেন বাবল তৈরি হয়। আর প্রতিনিয়ত এটা চলেই, এভাবে এটা কানের ভেতরকার বাতাসের চাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তবে যদি কিছু সময়ের জন্যেও অক্সিজেন বিলীন হয়ে যায়, তবে ছোটো এই  ইউস্টাচিয়ান টিউব ব্লক হয়ে যাবে, যেটা আপনার শ্রবণ শক্তি নষ্ট করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। আর এরকম পরিস্থিতিকে বলা হয়ে থাকে ব্যারোট্রমা এবং তার চরম পর্যায়।  

সবাই ভয়াবহ ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন

আপনি আক্রান্ত হতে পারেন স্কিন কান্সারে
আপনি আক্রান্ত হতে পারেন স্কিন কান্সারে

ট্রাইঅক্সিজেন, অক্সিজেন এর ত্রি-বন্ধন তথা ওজোন। এই ওজোন স্তর নামক একটি লেয়ার আমাদের পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল উপরে স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের নিচের অংশে অবস্থিত। এই ওজোন স্তরে ওজোন গ্যাস বিদ্যমান আমাদের পৃথিবী এবং প্রাণিজগৎকে সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মি বা ইউভি রশ্মি থেকে রক্ষা করে। আর এই ওজোন স্তর সূর্যের ক্ষতিকর মধ্যম মাত্রার(তরঙ্গদৈর্ঘ্যের) শতকরা ৯৭-৯৯ অংশই শোষণ করে নেয়। সূর্যের এই ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মি বা ইউভি রশ্মি প্রাণিজগৎ এবং মানুষের জন্য অত্যান্ত হুমকিস্বরূপ। আমরা যেহেতু আলোচনা করছি কয়েক সেকেন্ড এর জন্য এই পরিমণ্ডল থেকে অক্সিজেন বিলীন হয়ে গেলে কি হবে। সে হিসেবে নিশ্চয়ই এই ওজোন স্তরও বিলীন হয়ে যাবে। আর এর ফলে যে পরিমাণ অতিবেগুনী রশ্মি ঢুঁকে পরবে তা আমদের মানব দেহের স্কিন ক্যান্সার এবং বোন ক্যান্সার সৃষ্টি করার জন্য খুব যথেষ্ট! 

সকল পানি নিমিষেই গ্যাসে পরিণত হয়ে যাবে 

সব পানি মিলিয়ে যাবে
সব পানিই মিলিয়ে যাবে

যদি আমাদের পরিমণ্ডল থেকে কিছু সেকেন্ডের জন্যেও অক্সিজেন বিলীন হয়ে যায়। তবে নিমিষেই আমাদের পৃথিবীর বুকে থাকা সমস্ত জলাধারের পানি, ছাড়াও সকল পানি নিমিষেই বাষ্পের মত গ্যাসে পরিণত হয়ে উড়ে যাবে। আমরা জানি পানির দুইটি মুখ্য উপাদান, অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন। এর ভেতর ৩৩% অক্সিজেন এবং বাকি টুকু হাইড্রোজেন। তাই যদি অক্সিজেনই বিলীন হয়ে যায় তবে পানি নিমিষেই গ্যাসে পরিণত হয়ে উড়ে যাবে, হাইড্রোজেনএর কারনে। আর আমরা অনেকেই হয়ত জানি হাইড্রোজেন পর্যায় সারনির অনেক হালকা একটি গ্যাস। তো বুঝতে পাচ্ছি, সবুজ এই পৃথিবীকে মুহূর্তেই শুষ্ক মরুভূমি বানিয়ে দিতে মাত্র ৫ সেকেন্ডই যথেষ্ট।     

সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাবে 

আলো দেখতে হবেমেরু অঞ্চলের অরোরার মত
আলো দেখতে হবেমেরু অঞ্চলের অরোরার মত

অক্সিজেন চলে গেলে আরও বেশ কিছু ব্যাপার ঘটবে। যেমন ধরুন, পুরো পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যাবে যেমনটি রাতে হয়। কারন আলো, সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ায় জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান পরিমন্ডলের অক্সিজেন মলিকিউল, আর সেটিই যদি না থাকে তবে সূর্যের আলো দেখতে হবে মেরু অঞ্চলের অরোরা’র মত। 

সকল বিমান মাটিতে আছড়ে  পরবে  

আপনার বাসার অপর বিমান ভেঙে করতে পারে
আপনার বাসার অপর বিমান ভেঙে করতে পারে

প্রতিটি যান্ত্রিক গাড়ি চলার জন্য একটি বা তার অধিক কম্বাস্টন ইঞ্জিন ব্যাবহার করে থাকে; যেখানে জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তির উদ্ভব ঘটানো হয়। আর অক্সিজেন না থাকার ফলে এসব ইঞ্জিন চলার কোন প্রশ্নই ওঠে না, আর এতে করে সেইসময় আকাশে উড়তে থাকা সকল বিমান নিচে মাটিতে পতিত হবে। একইভাবে সকল পাওয়ার স্টেশন, জেনারেটর, ইঞ্জিন চালিন সব কিছুই আচমকা স্থবির হয়ে পরবে।       

পরিশেষে 

অক্সিজেন আমাদের আমাদের মানবজাতি সহ পুরো পৃথিবী এবং সৃষ্টির জন্য রহমতস্বরূপ। আমরা  সবাই খুব আরাম আয়েশে বসবাস করছি, তবে গুরুত্বপূর্ণ এই গ্যাসটি নিয়ে কয়জন ভাবছি? সিমেন্ট বা কনক্রিটের বিল্ডিং এর ক্ষেত্রে কনক্রিটের সকল অনু একসাথে যুক্ত থাকার জন্যেও কিন্তু বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন থাকার প্রয়োজন, তো এক হিসেবে  সকল বিল্ডিং থেকে শুরু করে কনক্রিটের সকল কাঠামো ভেঙ্গে যাওয়াও কিন্তু অসম্ভব নয়!      

আমরা মানবজাতি কি বোকা! বেখেয়ালি হয়ে নিজেদের মত চলে নিজেদের এই  জগতকে ধ্বংসের লীলাখেলায় মেতে উঠেছি।  

নানা কাজ কর্ম এবং পরিবেশ ধ্বংস করার জন্য মানব জাতি অনেক অভিশপ্ত। আমাদের সৃষ্টিকর্তা ভালবাসেন এবং আরও পরীক্ষা করছেন বলে হয়ত এখনও তার রহমতে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমাদের সহ পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেয়া তার কাছে সামান্য ব্যাপার মাত্র। অথচ আমরা কি বোকা, বেখেয়ালি হয়ে নিজেদের মত চলে নিজেই এই সৃষ্টি জগতকে ধ্বংসের লীলাখেলায় মেতে উঠেছি।    

এটি সায়েন্টিফিক বিভিন্ন তত্ত্ব মিলিয়ে একটি ফিকশনাল আর্টিকেল। আমার এই আর্টিকেলএর মুখ্য উদ্দেশ্য কেবল আমাদের পরিবেশের এই অতি প্রয়োজনীয় একটি উপাদান অক্সিজেন এর গুরুত্ব সম্পর্কে পাঠকদের সামান্য অবহিত করা। 


মহাজাগতিক কিউরেটর গল্পের একটি অংশ

‘তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস কর মানুষ এই জগতের শ্রেষ্ঠ প্রানি?’
‘তুমি কেন এটা জিজ্ঞেস করছ?’
‘এই পৃথিবীর দিকে তাকাও। দেখেছ বাতাসে কত দূষিত পদার্থ? কত তেজস্ক্রিয় পদার্থ? বাতাসের ওজোন কেমন করে শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখেছ? গাছ কেটে কত বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস করেছে দেখেছ?’
‘এর সবই কি মানুষ করেছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কি আশ্চর্য! আমি ভেবেছিলাম এরা বুদ্ধিমান প্রানি।’
(মহাজাগতিক কিউরেটর,মুহম্মদ জাফর ইকবাল)