দ্যা রেড প্ল্যানেট : মঙ্গলের রক্তিম গঠন এবং আবহাওয়ার পেছনের রহস্য

আমাদের এই সৌরজগতে লালগ্রহ ‘মঙ্গল’ এর অবস্থান ৪র্থ। সভ্যতার বিকাশ থেকেই রহস্যমন্ডিত এই মঙ্গল গ্রহ নিয়ে বিভিন্ন জাতির ছিল নানারকম ধারনা, হয়ত অনেক কিছু ছিল বাস্তব।  গ্রহটির রক্তিম পরিভূষণ এর জন্য এটি সবচেয়ে বেশি সমাদ্রিত ‘রেড প্ল্যানেট ’ নামে।  আজ থেকে হাজার বছর আগের রোমান সভ্যতা এই রেড প্ল্যানেটকে পূজা করত তাদের ‘গড অফ ওয়্যার’ হিসেবে, রেড প্ল্যানেটটি ছিল তাদের ‘যুদ্ধের দেবতা’। তাছাড়াও পৃথিবীর আরও অনেক সভ্যতার ভেতর জায়গা করে নিয়েছিল এই লাল গ্রহ তথা রেড প্ল্যানেট। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা এর নাম দিয়েছিল ‘হার দেশার’ যার অর্থ ‘লাল বস্তু’। চৈনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই রেড প্ল্যানেটকে নামকরন করেছিল “অগ্নি তারকা” হিসেবে।

মঙ্গল এর গঠন

এই মঙ্গল এর ভূমিও আমাদের পৃথিবীর মত কঠিন ‘রেগলিথ’ তথা কঠিন শিলা স্তর এর তৈরি। তবে যেখানে আমরা আমাদের এই কঠিন শিলা স্তর এর ওপর মাটি’র আস্তরন পাই, মঙ্গলে সেখানে দেখা যায় লাল ধুলোর আস্তরন; আর এই ধূলির কারনেই মঙ্গল এর আরেকটি নাম হল ধুলোর গ্রহ! যেখানে আমাদের পৃথিবীর ১-১০০ কিলোমিটার স্তর জুড়ে আছে মাটি এবং নরম শিলার আস্তরন; সেখানে মঙ্গলে তা ‘খণ্ডিত ধূলিকণা’ আমরা একে বলতে পারি অতান্ত মিহি ধূলিকণা; আমাদের গায়ে দেয়া ট্যালকম পাউডার এর মতন মিহি! এই ধূলিকণার রক্তিম বর্ণের পেছনে দায়ী এর ভেতর পাওয়া নানা রকম উপাদান।

এপর্যন্ত মঙ্গল এর এই ধূলিকণা’ময় মাটির ভেতর পাওয়া গিয়েছে সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ক্লোরাইড এবং ম্যাগনেসিয়াম এর উপাদান।  মঙ্গল এর এই রক্তিম ধুলো স্তর এর নিচে আছে আগ্নেয়গিরি থেকে উৎপন্ন এক প্রকার বিশেষ শিলা স্তর; যাকে বলা হয় ‘ভলক্যানিক বেসল্ট রক’।  মজার ব্যাপার হল মঙ্গলে এই পুরু মিহি ধূলিকণার স্তর-ই প্রায় ১-৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত!

অনেকে ভাবতেই পারেন মঙ্গলে কোনোকিছু পাঠালে তো এর ভেতর ঢুকে যাওয়ার কথা! তবে তা হয় না কারন এই ধুলো স্তরটা অনেক বেশি পুরু, বলা যায় অনেকটা আমাদের পৃথিবীর সাহারা মরুভূমির মতন।

মঙ্গল এর দুই বরফ মেরু!

Mars North Polar Cap in Summer

প্রথম মানুষ যিনি পৃথিবী থেকে মঙ্গলকে দেখে ছিলেন, তিনি হচ্ছেন বিজ্ঞানি গালিলিও গ্যালিলি। তখন মঙ্গল ব্যাপারটি ছিল খুবই রহস্যতে ঘেরা তারার জগতের লাল কোন এক বস্তু।  তবে আজকের ২১ শতকের বিজ্ঞানীরা ব্যাপারটি আমাদের সামনে অনেক সহজ করে তুলেছেন।  বর্তমান জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ঠিক পৃথিবীতে যেমন উত্তর এবং দক্ষিন মেরুতে পোলার আইস ক্যাপ রয়েছে, তেমনি মঙ্গলেও একই রকম উত্তর এবং দক্ষিন মেরুতে পোলার আইস ক্যাপ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন।  পৃথিবীর দুই মেরুর মতই মঙ্গল এর এই দুটি মেরুর পোলার ক্যাপ দেখতে একই হওয়ায় অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ধারনা করেন এটি পানির বরফ দ্বারা তৈরি।  তবে মঙ্গল এর এই পোলার আইস ক্যাপ কার্বন ডাই অক্সাইড এবং পানির বিশেষ বরফ দ্বারা তৈরি।

মঙ্গল এর তাপমাত্রা

সর্বপ্রথম টেলিস্কোপ দিয়ে যখন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এই দুটি পোলার ক্যাপকে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন, তখন তারা একে পৃথিবীর মতই পানির বরফের তৈরি মেরু হিসেবে কল্পনা করেছিলেন, তবে পরে আসল সত্যতা উঠে আসে।  পৃথিবীর মতই মঙ্গলে ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে , মঙ্গল এর গরম কালে সারা গ্রহব্যাপি দুই মেরুর এই কার্বন ডাই অক্সাইড বরফ ছড়িয়ে পরতে শুরু করে ; তবে সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকার কারনে এর বায়ুমণ্ডল অনেক শীতল আর পৃথিবীর অতটা গরম না বলতে গেলে ।  একইভাবে মঙ্গল এর শীতকালে এই কার্বন ডাই অক্সাইড দুই মেরুতে জমাট বাধে।  সূর্য থেকে অনেক দূরে থাকার কারনে এর এই পাতলা শীতল বায়ুমণ্ডল এর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা নাসা এর ‘কিউরিওসিটি’ মঙ্গল জান দ্বারা সর্বোচ্চ রেকর্ড করা হয়েছে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।  তবে রাতের বেলাতেই এর তাপমাথা মাইনাস ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়!

মঙ্গল তথা রেড প্ল্যানেট নিয়ে মহাকাশ বিভাগে আবার কোন এক; একক বিষয়ভিত্তিক পোস্ট নিয়ে পরবর্তীতে আমরা জানব আরও বিস্তারিত।  সে পর্যন্ত ভালো থাকুন।