সংবাদ

হুয়াওয়ে এর ৫জি টেকনোলজি : আমেরিকার কেনো এত ভয়!

চীন এবং আমেরিকার দুই প্রধান যখন তাদের ভেতর চলমান ট্রেড ওয়ার কে শিথিল করার জন্য; এবং নিজেদের সম্পর্ককে উন্নত করার জন্য আর্জেন্টিনায় এক নৈশভোজে একত্রিত হয়েছিলেন।  ঠিক তার বিপরীত দিকে উত্তর আমেরিকার আরেকটি দেশ কানাডার ভ্যাংকুভার বিমানবন্দরে ঘটে গেল এক বিপত্তি! আর এই বিপত্তি চীন এবং আমেরিকার ভেতর নতুন করে আবার ঝামেলার সৃষ্টি করে দিল।

মেং ওয়ানঝু গ্রেফতার

হুয়াওয়ে এর সি-এফ-ও ‘মেং ওয়ানঝু’ / ইমেজ ক্রেডিট : aisa times

বিমানবন্দরটিতে তখন হংকং থেকে আসা যাত্রীরা মেক্সিকো যাওয়ার জন্য কানেকটিং ফ্লাইট ধরার জন্য ৮১ নম্বর গেইট দিয়ে যাচ্ছিল।  আর এই সকল যাত্রীদের মধ্যে ছিলেন ৪৬ বছর বয়সী মেং ওয়ানঝু।  মেং ওয়ানঝু ছিলেন চায়না কোম্পানি হুয়াওয়ে এর সি এফ ও।  আরেকটি বড় পরিচয় তিনি প্রতিষ্ঠাতা ‘রেন জেনফি আর জুন’ এর কন্যা।   তবে কোন এক কারনে মেং ওয়ানঝু তার ১৬ বছর বয়স থেকে তার বাবার বদলে তার মায়ের পদবি ব্যাবহার করতেন।  সেদিন যখন ভ্যাংকুভার বিমানবন্দরে মেং ওয়ানঝু কানেকটিং ফ্লাইট ধরার জন্য ৮১ নম্বর গেইট দিয়ে যাচ্ছিলেন; তখন কানাডিয়ান অথোরিটি সেখানেই তাকে গ্রেফতার করে ফেলে।  নিশ্চয়ই কানাডায় এর পেছনে আমেরিকার নির্দেশনা ছিল।  আমেরিকা দ্বারা মেং এর ওপর যেসব চার্জ আরোপ করা হয়েছিল তা যদি সত্যি হয় তাহলে ওয়াঞ্জো মেং এর ৩০ বছরের জেল হতে পারত।   কানাডা সরকার চাচ্ছিল উনাকে এখন কোনোভাবে আমেরিকার হাতে তুলে দেয়া হোক।

তার বিরুদ্ধে মূল যে অভিযোগ ছিল তা হলো মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানে টেলিকম সরঞ্জাম সরবরাহ করা।  মেং ওয়ানঝু জানতেন উনার নামে ২০১৮ সালের আগস্ট মাস থেকেই গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে।  এপ্রিল ২০১৭ থেকে হুয়াওয়ে এর অপর অপরাধ মুলক তদন্ত এর শুরু থেকেই মেং ওয়ানঝু আমেরিকায় যাতায়াত বন্ধ করে দেন; যদিও আমারিকার বোস্টনে তার ছেলে থাকতো তবুও।  তবে মেং ওয়ানঝু এটা বুঝতে পারেননি যে; তাকে কানাডা থেকে গ্রেফতার করা হবে, ২০০৯ পর্যন্ত তিনি এই দেশের নাগরিকও ছিলেন।

হুয়াওয়ে এর আতাত

মেং এর বিরুদ্ধের চার্জসীট গুলো কয়েকদিন পরে উনার জামিনের শুনানির দিনে আনা হয়।  এই দিন উঠে আসে,  মেং ওয়ানঝু স্কাইকম নামে হং কং এ একটি কোম্পানি চালাতেন হুয়াওয়ে এর পৃষ্ঠপোষকতায়। যার মাধ্যমে আমেরিকায় তৈরি পণ্য ইরানে পাঠানো হত।  যা আমেরিকার আইনের বরখেলাপ! বিপরীত উকিলের মতে মেং ওয়ানঝু ২০১৩ সালে হুয়াওয়ে এর মাধ্যমে ব্যাবসা চালিয়ে যেতে আমেরিকার ব্যাংককে মিথ্যে বলেছিল।  তবে মেং ওয়ানঝু এর ভাষ্যমতে, না হুয়াওয়ে এবং স্কাইকম আলাদা কোম্পানি; হুয়াওয়ে এর সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।

হুয়াওয়ে এর অপর অনেক আগে থেকে তদন্ত চলছিল; তাদের টেলি-কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি কিউবা, সিরিয়া, ইরান, সুদান, উত্তর কোরিয়া এর মত দেশে সরবরাহ করার জন্য। আর এমন সব গোপন তথ্য আমেরিকাকে প্রেরন করেছিল হুয়াওয়ে এর চায়না প্রতিদ্বন্দ্বী জিটিই কর্পোরেশন।  এমনকি এই জিটিই কর্পোরেশন এর বিরুদ্ধেও সিরিয়া,উত্তর কোরিয়া এবং ইরানে আমেরিকার টেলি-কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি সরবরাহের অভিযোগ এনেছিল আমেরিকা, এরপরই জিটিই কর্পোরেশন  হুয়াওয়ে এর তথ্যও ফাঁশ করে দেয়।  হুয়াওয়ে বর্তমানে চীনএর বৃহত্তম টেকনলজি কোম্পানি এবং তারা তাদের রিসার্চ এবং ডেভেলপমেন্ট এর পিছনে বছরে ১৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করছে; আর যা আমেরিকার অ্যাপেল এর চাইতেও ৫ গুন বেশি।  হুয়াওয়ে পৃথিবীর ১ নম্বর টেলি-কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি তৈরিকারক।  আর শীর্ষ স্মার্টফোন তৈরিকারক এর তালিকায় স্যামসাং এর পরেই এর স্থান; আর ৩য় স্থানে গিয়ে অ্যাপেল।

আমেরিকার হুয়াওয়ে’কে ভয়

সবকিছুর ফলে ৫জি প্রযুক্তিতে যে কোম্পানিটি খুব দ্রুত গতিতে  এগিয়ে আসছে তা হলো হুয়াওয়ে।  ৫জি প্রযুক্তি হবে আগামি সময়ের আইওটি তথা ইন্টারনেট অফ থিংস এর মূল চালিকা শক্তি; আর হুয়াওয়ে বর্তমানে এই ৫জি প্রযুক্তিতে খুব শক্তপোক্ত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে; কোন কোম্পানি যার ধারে কাছে আসতে পারেনি। ১৭-১৮ সালেই হুয়াওয়ে এরিক্সন এবং নকিয়াকে পেছনে ফেলে নিজেদের পৃথিবীর সেরা টেলি-কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি তৈরিকারক হিসেবে  প্রতিষ্ঠিত করেছে।  বর্তমানে এই হুয়াওয়ে এর বার্ষিক আয় ১০৮ বিলিয়ন ডলার! বর্তমানে বিশ্ব বাজারের ১৫% হুয়াওয়ে এর নিজেদের দখলে।

হুয়াওয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা রেন জেনফি

মিডিয়া থেকে দূরে থাকা হুয়াওয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা রেন জেনফি বহুদিন ধরেই চীন এর কমিউনিস্ট পার্টির একজন বড় সদস্য।  যার ফলে তিনি চীন সরকার এর থেকে বহু আগে থেকেই হুয়াওয়ে এর জন্য অনেক আর্থিক সহায়তা এবং নানান সুবিধা পেয়েছেন।  আর এটা আমেরিকার মত দেশের অনেক বড় ভয়ের কারন।  তারা ভাবে যে হুয়াওয়ে চীন সরকারের হয়ে উন্নত বিশ্বে গুপ্তচোরের কাজ করতে পারে, বিশেষ করে নতুন আইন পাস করার ক্ষেত্রে।  ‘কেননা সরকারের অনুরোধে যেকোনো চীনা কোম্পানি তার দেশের জন্য কাজ করতে বাধ্য থাকে!

যার ফলে যেসব দেশ আমেরিকার সুল্ক নীতির বিরোধিতা করেছিল, তারাও এখন ভয়ে তাদের দেশে হুয়াওয়ে এর ৫জি প্রযুক্তি প্রদান করা থেকে তাদের দূরে সরে রাখতে শুরু করেছে।   আর এই কারনে জাপান সরকার তাদের সব সরকারি কর্মকর্তাদের হুয়াওয়ে এর পণ্য ব্যবহার করা হতে বিরত রাখতে নির্দেশ দেয়।  একই ভাবে নিউজিল্যান্ড,ফ্রান্স এবং কানাডা তাদের দেশে হুয়াওয়ে এর ৫জি প্রযুক্তি ব্যান করে দেয়।

হুয়াওয়ে ৫০ টির মধ্যে ৪৫ টি বড় বড় প্রোভাইডার এর নিকট তাদের ৪জি  টেলি-কমিউনিকেশন যন্ত্রপাতি সাপ্লাই করেছিল; তবে এবার সব বিধি-নিষেধ তোয়াক্কা না করে ২০১৮ সালেই ইতিমধ্যে তারা ২৬ টি  ৫জি সম্পর্কিত কন্ট্র্যাক্ট সই করে ফেলেছে।  বেশ কিছু দেশ তাদের দেশে হুয়াওয়ে এর এই ৫জি টেস্টিং থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছে।  তবে চীন এর সাথে খুব  ভালো সম্পর্ক থাকার কারনে আমাদের বাংলাদেশ এই প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহন করতে সম্মতি জানিয়েছে।  আর ইতিমধ্যে ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই আমাদের দেশে হুয়াওয়ে এর ডেমো ৫জি টেস্টিং সম্পন্ন হয়েও গিয়েছে; যেখানে সর্বোচ্চ স্পিড হয়েছিল ৪.১৭ জিবিপিএস।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Most Popular

ফন্ডঅফটেক একটি বাংলাদেশ ভিত্তিক টেকনোক্র্যাট নিউজ পোর্টাল। আমরা এই প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি ভিত্তিক মানসম্মত কনটেন্ট প্রকাশ নিয়মিত প্রকাশ করার চেষ্টা করে থাকি।

আমাদের স্লোগান, 'প্রযুক্তি সংবাদ, যেটা মূল্য রাখে।'

To Top